বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান


বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান

Jabir-Ibne-Haiyyan-221x300

জাবির ইবনে হাইয়ান এর পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। কেউ
তাকে আল হাররানী এবং ‘আস্ সুফী’ নামেও অভিহিত করেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান
ছাড়াও চিকিৎসা শাস্ত্র, দর্শণ, যুদ্ধবিদ্যা, রসায়ন, জ্যামিতি প্রভৃতি
বিষয়ে পান্ডিত্য লাভ করেন।

বিজ্ঞানীর জীবনে অবিস্মরণীয় ঘটনা
জাবির ইবন হাইয়ানকে বলা হয় রসায়ন বিজ্ঞানের জনক। তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
রসায়নবিদদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর ‘কিতাবুস সুসুম’ (Book of
Poison) বইটি আরব ঔষধবিজ্ঞানের অন্যতম উৎস।

গুপ্তবিদ্যার প্রতি মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। “আল কেমি” হচ্ছে সেই
রকম গুপ্তবিদ্যা, যার দ্বারা মানুষ “এলিক্সির” নামে একটি যাদুকরী বস্তু
তৈরী করতে সক্ষম হবে। আর এই এলিক্সিরের ছোঁয়ায় লোহা হয়ে যাবে সোনা, তামা
হয়ে যাবে রূপা, আর মানুষের আয়ু যাবে বহুগুন বেড়ে!! লোহা থেকে সোনা বানানো
কিংবা জীবনকে দীর্ঘায়িত করার বাসনাই ছিল আল কেমী বিদ্যার মূল উদ্দেশ্য। আল
কেমী বহু আগে থেকে চলে আসা একটি বিষয়, পৃথিবীর মানুষ লোহা থেকে সোনা
বানানোর অসম্ভব চেষ্টা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই করছে। আল কেমী বিদ্যাটি
কিছুটা গুপ্ত হওয়ায় জাবেরের বইগুলোও অনেকটা রূপক ভঙ্গীতে লেখা। আল কেমি
বিষয়ে লেখা তার বই “কিতাব আল জোহরা”তে তিনি লিখেছেন, “আল্লাহ যাদের
ভালবাসেন তারা ব্যাতীত বাকীদের হতভম্ব করা এবং ভুল পথে নেয়াই এর উদ্দেশ্য।”

আবার এই জাবিরই লিখেছেন, “আমার “মাস্টার” আমাকে শাসাচ্ছেন, যাতে এসব
বিদ্যা কোন অবিবেচকের হাতে না পড়ে।” আলকেমীর বিদ্যা গুপ্ত রাখার মানসিকতায়
তিনি বইসমূহ লিখেছেন সাধারণ যাতে সহজ বুঝতে না পারে সেই দৃষ্টিকোন্ থেকে।

একসময় আল কেমীর চর্চা ও অনুশীলন থেকে জাবির আবিষ্কার করলেন অনেক কিছু।
তিনি আবিষ্কার করেন কি করে তরলের মিশ্রন থেকে একটি তরলকে আলাদা করা যায়,
যা ডিস্টিলেশন নামে পরিচিত, আবিষ্কার করেন একুয়া রেজিয়া নামে একটি মিশ্রন
যা সোনাকে গলিয়ে দিতে সক্ষম এবং উদ্ভাবন করেন অগুনতি কেমিক্যাল
সাবসট্যান্স – যা মরিচা প্রতিরোধ, স্বর্নের কারুকাজ, পোশাকের ওয়াটারপ্রুফ
সহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত হয়। আল কেমী থেকে তিনি সিস্টেমেটিক
এক্সপেরিমেন্টেশনের দ্বারা শুরু করেন আরেকটি বিষয়, যা পরিচিতি লাভ করে
কেমেস্ট্রি হিসেবে।

 

বিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল
এসো এবার এই বিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল জেনে নিইঃ

নাম- আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান।
জন্ম- ৭২২ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যু- ৮০৩ খ্রিস্টাব্দে।
বাসস্থান- কুফা শহরে।

শিক্ষা জীবন- জাবির ইবনে হাইয়ান দক্ষিণ আরবে শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা
লাভের প্রতি তার ছিল প্রচন্ড আগ্রহ। বলা যায়, অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে
তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পারদর্শী হন।

শিক্ষালাভ শেষ হলে তিনি পিতার কর্মস্থান কুফা নগরীতে গিয়ে বসবাস করেন।
সেখানে তিনি প্রথমে চিকিৎসা ব্যবসায় আরম্ভ করেন। এ সূত্রেই তৎকালীন
বিখ্যাত পন্ডিত ইমাম জাফর সাঢিকের অনুপ্রেরণায় তিনি রসায়ন ও চিকিৎসা
বিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেন। আর অল্প সময়ে রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসেবে
সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

ইমাম জাফর সাদিকই জাবিরকে বারমাক বংশীয় কয়েকজন মন্ত্রীর সাথে পরিচয়
করিতে দেন। একবার ইয়াহিয়া বিন খালিদ নামক জনৈক বারমাক মন্ত্রীর এক প্রিয়
সুন্দরী দাসী মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অনেক সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসকরা
তার চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হন। এ সময় মন্ত্রী প্রাসাদে জাবির ইবনে হাইয়ানের
ডাক পড়ে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে জাবির তাকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ
করে তোলেন। এতে মন্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বে গড়ে ওঠে। বারমাস বংশীয় কয়েকজন
মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় তিনি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হন। এর
ফলে তিনি রসায়ন বিজ্ঞান সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা চালাতে থাকেন। তিনি
বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য ও বিভিন্ন পদার্থ আবিষ্কার করেন। এর ফলে
শ্রেষ্ঠ রসায়ন বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি সর্বদা হাতে কলমে
কাজ করতেন এবং পর্যবেক্ষণ করে তার ফলাফল লিখে রাখতেন। তার মতে,
‘রাসায়নিকের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাজ হলো হাতে কলমে পরীক্ষা চালানো’।

অধিকাংশ সময় তিনি বাগদাদে কাটিয়েছেন। তিনি অষ্টম শতাব্দীর শেষ দিকে
বাগদাদেই রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর গবেষণা করতে থাকেন। এখানে তাঁর
গবেষণাগার ছিল।
তাঁর অবদান মৌলিক। তিনি বস্তুজগতকে প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন, প্রথম
ভাগে স্পিরিট, দ্বিতীয় ভাগে ধাতু এবং তৃতীয় ভাগে যৌগিক পদার্থ। তাঁর এ
আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা বস্তুজগতকে তিনটি ভাগে
ভাগ করেন, বাষ্পীয়, পদার্থ ও পদার্থ বহির্ভূত।  জাবির ইবনে হাইয়ানই
সর্বপ্রথম নাইট্রিক এডিস আবিষ্কার করেন। এছাড়া সালফিউরিক এসিড আবিষ্কার
করেন। তিনি তাঁর ‘কিতাবুল ইসতিতমাস’ গ্রন্থে নাইট্রিক এসিড তৈরির ফর্মূলা
বর্ণনা দেন।

 

অন্যতম অবদানসমূহ :
১.    তাঁর মতে, ‘রাসায়নিকের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাজ হলো হাতে কলমে পরীক্ষা চালানো’।
২.    তিনি বস্তুজগতকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন, প্রথম ভাগে স্পিরিট, দ্বিতীয় ভাগে ধাতু এবং তৃতীয় ভাগে যৌগিক পদার্থ।
৩.    তিনি নাইট্রিক ও সালফিউরিক এডিস আবিষ্কার করেন।

তিনি গ্রিক ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র, ইউক্লিড ও আল
মাজেস্টের ভাষ্য, দর্শন, যুদ্ধবিদ্যা, রসায়ন, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও
কাব্য সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। বিজ্ঞানে তাঁর অবদান আজও চিরস্মরণীয়

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s